বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২৬ - ১২:১২
আধুনিক ইসলামী সভ্যতা বৈশ্বিক স্তরে 'জ্ঞান' এবং 'নৈতিকতা'-কে সংযুক্ত করে

আব্দুল্লাহ মানাজিত, থাইল্যান্ডের একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সাইয়্যিদ আলী খামেনেয়ীর চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো, বিশেষ করে ‘আধুনিক ইসলামী সভ্যতা’ তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করে বলেন, এই ধারণা কেবল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত সক্ষমতার পুনর্জাগরণের একটি দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর মতে, এমন একটি সভ্যতা-যা জ্ঞান, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, আধ্যাত্মিকতা এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক অর্জনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে-ভবিষ্যৎ বিশ্বসভ্যতায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের ‘শহীদ নেতা’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত চিন্তার বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সংলাপ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে থাইল্যান্ডে ইরানের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদল, ইসলামী সংস্কৃতি ও যোগাযোগ সংস্থার বৈজ্ঞানিক ও বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা বিভাগ, তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইরানের কুরআন ও বাইবেল গবেষণা সমিতির যৌথ উদ্যোগে ইরানের শহীদ নেতার চিন্তায় নতুন দিগন্তের পুনঃপাঠ শীর্ষক একটি অনলাইন সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

এতে ইরান ও থাইল্যান্ডের গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। আলোচনায় ইরানের ‘শহীদ নেতা’র চিন্তা, ব্যক্তিত্ব এবং বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে মতবিনিময় হয়।

গোলামআলী হাদ্দাদ আদেলের বক্তব্য

সম্মেলনের প্রধান বক্তা ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য একাডেমির সভাপতি এবং সাদি ফাউন্ডেশনের প্রধান গোলামআলী হাদ্দাদ আদেল। তিনি পাঠানো এক বার্তায় ‘শহীদ নেতা’র চিন্তাধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, তাঁর মতে এই নেতার ব্যক্তিত্বে এমন কোনো ত্রুটি ছিল না যা তিনি দীর্ঘদিনের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণে দেখতে পেয়েছেন। একজন যোগ্য নেতার মধ্যে যে গুণাবলি প্রত্যাশিত, সেগুলো সর্বোচ্চ মাত্রায় তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল।

হাদ্দাদ আদেলের ভাষায়, সততা, ব্যক্তিগত পবিত্রতা, সরল জীবনযাপন, পার্থিব জৌলুসের প্রতি অনাসক্তি এবং জাতির মর্যাদা, দেশের নিরাপত্তা, সমাজের উন্নতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জনগণের স্বার্থ ও ইসলামী বিপ্লবের আদর্শকে অগ্রাধিকার দিতেন।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বরাজনীতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান তাঁকে বন্ধু ও শত্রুকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে সহায়তা করেছিল। তাঁর মতে, আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো আকর্ষণীয় স্লোগানের আড়ালে স্বাধীন দেশগুলোকে নির্ভরশীল করে তুলতে চায়। এই কৌশলগত উপলব্ধিই তাঁর বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ভিত্তি ছিল।

তিনি সাহস ও দৃঢ়তাকেও তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, তিনি রাজনৈতিক চাপ ও বৈদেশিক হুমকির মুখেও দৃঢ়তার সঙ্গে অবস্থান নিতেন এবং জনগণকে মর্যাদা, স্বাধীনতা, আত্মবিশ্বাস ও প্রতিরোধের আহ্বান জানাতেন।

থাই গবেষকদের মতামত

থাইল্যান্ডের ভূরাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির গবেষক সোমচাই বলেন, এই ধরনের আন্তর্জাতিক সেমিনার সমসাময়িক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের চিন্তাকে আবেগ বা রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে একাডেমিকভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ সৃষ্টি করে।

তিনি বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একজন গবেষক হিসেবে তিনি ইরানের ‘শহীদ নেতা’র ব্যক্তিত্বকে রাজনৈতিক বিচার নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তাঁর কৌশলগত প্রভাবের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মতে, তিন দশকেরও বেশি সময়ের নেতৃত্বে তিনি সামরিক সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও ভিন্নধর্মী কৌশলগত ব্যবস্থাপনার একটি মডেল গড়ে তুলেছিলেন।

সোমচাই আরও বলেন, প্রচলিত অস্ত্র প্রতিযোগিতার পরিবর্তে তিনি ‘অসম প্রতিরোধ’ (Asymmetric Deterrence) এবং ‘কৌশলগত গভীরতা’ (Strategic Depth)-এর নীতি অনুসরণ করেন, যা পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।

ব্দুল্লাহ মানাজিতের বক্তব্য

আব্দুল্লাহ মানাজিত বলেন, ‘শহীদ নেতা’র চিন্তার প্রথম ভিত্তি ছিল ধর্ম ও রাষ্ট্রপরিচালনার সমন্বয়। তাঁর মতে, ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের সমষ্টি নয়; বরং রাজনীতি, অর্থনীতি, ন্যায়বিচার, শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং সামাজিক কল্যাণসহ সমাজ পরিচালনার একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরতা পরিহার তাঁর চিন্তার অন্যতম ভিত্তি ছিল। মুসলিম দেশগুলোর উচিত নিজেদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে অগ্রগতির পথ অনুসরণ করা।

তিনি আরও বলেন, শিয়া ও সুন্নিসহ বিভিন্ন ইসলামী মাজহাবের মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতার ওপর তিনি গুরুত্ব দিতেন এবং দারিদ্র্য, চরমপন্থা, দখলদারিত্ব ও বিদেশি হস্তক্ষেপের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্যকে অপরিহার্য মনে করতেন।

‘আধুনিক ইসলামী সভ্যতা’ তত্ত্ব সম্পর্কে মানাজিত বলেন, এটি কেবল ইরানের জন্য নয়; বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের একটি দৃষ্টিভঙ্গি। এই সভ্যতা জ্ঞান, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, আধ্যাত্মিকতা এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক অর্জনের সমন্বয়ে বিশ্বসভ্যতার ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, তাঁর চিন্তায় ফিলিস্তিন প্রশ্ন কেবল একটি ভূখণ্ডগত বিরোধ নয়; বরং এটি ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয়।

অন্যান্য বক্তাদের বক্তব্য

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদপ্রধান পুর ইজ্জত ‘উন্নত শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের শর্তাবলি’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, আদর্শ শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তিবাদ, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি স্বাধীনভাবে নির্বাচন, স্বাধীন সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্তের দায়িত্ব গ্রহণ এবং ধারাবাহিকভাবে এই নীতিগুলো অনুসরণের কথা উল্লেখ করেন।

থাইল্যান্ডের ইসলামী গবেষক মুহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, ‘শহীদ নেতা’র চিন্তার দুটি প্রধান উত্তরাধিকার হলো আধিপত্যবাদী শক্তির ‘অপরাজেয়তার’ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং শাহাদাতের সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করা। তাঁর মতে, এই উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মর্যাদা, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার আদর্শে অনুপ্রাণিত করবে।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ ওয়ায়েজি ‘ইমাম খামেনেয়ীর চিন্তায় বিশ্বের ভবিষ্যৎ: জ্ঞান ও ক্ষমতার ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনায় বলেন, ভবিষ্যৎ বিশ্ব আধ্যাত্মিকতা, জ্ঞান ও ক্ষমতার পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর গড়ে উঠবে। তাঁর মতে, প্রকৃত ক্ষমতা কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক শক্তি নয়; বরং জ্ঞান, বৈধতা, যোগ্যতা, জনআস্থা ও কৌশলগত স্বাধীনতার সমন্বয়।

থাইল্যান্ডে ইরানের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি মাহদি জারে-বি-আইব বলেন, ভবিষ্যৎ বিশ্ব সংলাপ, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং চিন্তার আদান-প্রদানের মাধ্যমে গড়ে উঠবে। তাঁর মতে, এই ধরনের সম্মেলন পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বৈজ্ঞানিক-সাংস্কৃতিক সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি আরও বলেন, ‘শহীদ নেতা’র চিন্তাধারা মূলত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর মতে, সভ্যতা প্রথমে মানুষের মন, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধে জন্ম নেয়; পরে সমাজে তার বাস্তব রূপ দেখা যায়। তাই একটি উন্নত সমাজ গড়তে বিশ্বাস, আশা, আদর্শ ও অভিন্ন মূল্যবোধের মতো সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পুঁজি অপরিহার্য।

ইরানে থাইল্যান্ডস্থ রাষ্ট্রদূত নাসিরুদ্দিন হায়দারি তাঁর আলোচনায় ‘মর্যাদা, প্রজ্ঞা ও কল্যাণ’-এই তিন নীতিকে ইরানের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন।

ইসলামী সংস্কৃতি ও যোগাযোগ সংস্থার বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলী রাব্বানি বলেন, ‘আধুনিক ইসলামী সভ্যতা’-র ধারণাই এই চিন্তাধারার কেন্দ্রীয় উপাদান। তাঁর মতে, ইসলামী বিপ্লবকে একটি ধাপে ধাপে অগ্রসরমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়েছে, যা রাষ্ট্র নির্মাণ থেকে উম্মাহ গঠন এবং শেষ পর্যন্ত সভ্যতা নির্মাণের দিকে এগিয়ে যায়। তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে আধ্যাত্মিকতা, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও প্রতিরোধের সমন্বয় একটি নতুন ও মানবিক বিশ্বব্যবস্থা গঠনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ফারসি ভাষাকে তিনি ইরান ও ইসলামের সাংস্কৃতিক, দার্শনিক, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ঐতিহ্যের ধারক এবং ইরানের ‘সফট পাওয়ার’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখতেন।

সম্মেলনের আরেক বক্তা, ইসলামী অধ্যয়নের গবেষক ফাতিমা চাওংগুয়ান বলেন, ‘শহীদ নেতা’র চিন্তা শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি পথনকশা। তাঁর মতে, এই চিন্তাধারা সমসাময়িক বিশ্বের জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কার্যকর মডেল উপস্থাপন করে এবং গবেষণা, শিক্ষা, অর্থনীতি, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংলাপের ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নের জন্য একাডেমিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, কুরআনের শিক্ষার আলোকে মুসলিম বিশ্বের গবেষক সমাজ আরও ন্যায়ভিত্তিক, নৈতিক এবং মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন বিশ্ব গঠনে অবদান রাখবে এবং এই বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha